ঢাকা রবিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৯

চালকের আসনে বাংলাদেশ


|| প্রকাশিত: 6:30 pm , December 1, 2018

পিনিউজ ডেস্ক: সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ভালোই চেপে ধরেছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। ৫ উইকেট ২৫৯ রান নিয়ে মাঠে নেমে মাহমুদউল্লাহর বীরোচিত সেঞ্চুরিতে সবকটি উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের রান তুলেছে ৫০৮। যেটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংস। এরপর বোলিংয়ে এসেই ক্যারিবিয় শিবিরে টাইগার স্পিন আক্রমণ। একে একে পাঁচ ব্যাটসম্যানকে বোল্ড করে সাকিব-মিরাজরা ভেঙ্গেছেন ১২৮ বছরের রেকর্ড। টাইগার স্পিন ঘূর্ণিতে দ্বিতীয় দিন শেষে ৫ উইকেট হারিয়ে ৭৫ রান তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। টাইগারদের থেকে পিছিয়ে আছে ৪৩৩ রানে।

৫০৮ রানের পাহাড়সম বোঝা নিয়ে ব্যাট করতে নেমেই খেই হারিয়ে ফেলেছে ক্যারিবিয়ানরা। ওপেনিংয়ে ব্যাটিং করতে নেমেছিলেন ব্রাথওয়েট ও পাওয়েল। কিন্তু বোলিংয়ে এসেই উইন্ডিজ ইনিংসে আঘাত হানলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। ওভারের শেষ বলে সাকিবের বলে বোল্ড হয়ে শুন্যরানে ফেরেন উইন্ডিজ অধিনায়ক কার্লোস ব্র্যাথওয়েট। এরপর দলীয় ৬ রানেই আবার মিরাজের আক্রমণ। ফেরালেন আরেক ওপেনার পাওয়েলকে। ১৭ রানের মাথায় আমব্রিসকে বোল্ড করেন সাকিব। এরপরই ২০ রানের মাথায় মিরাজ পাল্লা দিয়ে বোল্ড করেন রোস্টন চেজকে। পরে আবার মিরাজ হোপকেও বোল্ড করেন। পাঁচ উইকেটই বোল্ড করে তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। ক্রিজে আছেন সিমরণ হেটমায়ার (৩২) ও ডউরিচ (১৭)।

এর আগে দ্বিতীয় দিন অপরাজিত থেকে ব্যাটিংয়ে নামেন সাকিব আল হাসান এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। এই জুটিতে আসে ১১১ রান। দলীয় ৩০১ রানের মাথায় বাংলাদেশ ষষ্ঠ উইকেট হারায়। কেমার রোচের বলে শাই হোপের তালুবন্দি হন সাকিব। টাইগার দলপতি সাজঘরে ফেরার আগে করেন ৮০ রান। ১৩৯ বলে সাজানো সাকিবের ইনিংসে ছিল ৬টি বাউন্ডারি।

সাকিব ফিরে গেলেও এক প্রান্ত ধরে খেলেছেন রিয়াদ। সাকিবের চেয়ে তুলনামূলক ধীর খেললেও ৮৮ বলে ৪ চারের মারে দিনের এগারতম ওভারে নিজের ফিফটি তুলে নিয়েছেন তিনি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে তিনি খেলেছিলেন ১০১ রানের অপরাজিত ইনিংস।

সে ফর্ম বজায় রাখলেন চলতি টেস্টেও। মাহমুদউল্লাহর ব্যাটের নির্ভরতাতেই মূলত বড় সংগ্রহের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ। আট নম্বরে নামা উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান লিটন দাস ব্যক্তিগত ৫৪ রানে দ্বিতীয় সেশনের কিছু পরেই বিদায় নেন। মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তার জুটিতে আসে ৯২ রান। ক্রেইগ ব্রাথওয়েইটের বলে বোল্ড হওয়ার আগে লিটন ৬২ বলে আটটি চার আর একটি ছক্কা হাঁকান। দলীয় ৩৯৩ রানের মাথায় বাংলাদেশ সপ্তম উইকেট হারায়। এরপর ২৬ বলে ১৮ রান করে বিদায় নেন মেহেদি হাসান মিরাজ।

জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে রানের ফোয়াড়া বইছে রিয়াদের ব্যাটে। আগের সিরিজেই সেঞ্চুরি পূরণ করেন এই ব্যাটসম্যান। মাঝে এক টেস্ট বিরতি দিয়ে আবারও শতকের দেখা পেলেন তিনি। রোস্টন চেসের বলে বাউন্ডারি মেরে তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছান মাহমুদউল্লাহ। সাত নম্বরে ব্যাট করা তৃতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি পূরণ করেন তিনি। ২০৩ বলে আসে তার সেঞ্চুরি। এরপর ২৬ বলে ১৮ রান করে বিদায় নেন মেহেদি হাসান মিরাজ। শেষ সেশনে ব্যাটিংয়ে নেমে নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যক্তিগত ২৬ রানে বিদায় নেন তাইজুল ইসলাম।

অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে আমিনুল ইসলামের ৩৮০ বল খেলা এখনো পর্যন্ত ক্রিকেটের বড় সংস্করণের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বেশি বল খেলা। কাল নিজের টেস্ট অভিষেকে সাদমান ইসলাম ১৯৯ বল খেলেছিলেন। আজ মাহমুদউল্লাহ তাকে ছাড়িয়ে খেলেছেন ২৪২ বল। চা বিরতির ঠিক আগেই সেঞ্চুরি পূরণ করেছেন মাহমুদউল্লাহ। দলীয় ৫০৮ রানে ওয়ারিকানের বলে বোল্ড হয়ে যাওয়ার আগে নিজের ঝুলিতে পুরেছেন ১৩৬ রান। এটি তার ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস। ১২ রানে অপরাজিত আছেন নাঈম।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে দুটি করে উইকেট পান কেমার রোচ, দেবেন্দ্র বিশু, কার্লোস ব্রাথওয়েইট এবং জোমেল ওয়ারিকান। একটি করে উইকেট পান শিরমন লুইস এবং রোস্টন চেজ।

এর আগে সৌম্যকে নিয়ে অভিষেক টেস্টে ওপেন করতে নামেন সাদমান। বাংলাদেশের ৯৬ তম টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে মিরপুরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় সাদমান ইসলামের। কিন্তু সাদমানকে রেখে একে একে ফিরে যান সৌম্য, মুমিনুল ও মিঠুন। তবে দারুণ খেলতে থাকা সাদমান ফিফটি করে বিশুর বলে আউট হন। পরে ফিফটি করে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন সাকিব আল হাসান। তার সঙ্গী মাহমুদউল্লাহও খেলেছেন হার না মানা ইনিংস। প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশ ৫ উইকেট হারিয়ে ২৫৯ রান তুলেছে।

সাদমানকে নিয়ে দলকে উড়ন্ত সূচনা এনে দিয়েছিলেন সৌম্য সরকার। কিন্তু স্কোরবোর্ডে ৪২ রান যোগ করার পর ব্যক্তিগত ১৯ রানে রস্টন চেজের বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই বাঁহাতি। এ নিয়ে টানা ১০ ইনিংসে ব্যর্থ সৌম্য। ফিফটি দূরে থাক কোনো চল্লিশোর্ধ্ব ইনিংসও উপহার দিতে পারেনি তিনি।

বিরতির আগে বাংলাদেশের উইকেট হারানো যেন এক পরিচিত দৃশ্য। সেই ধারাবাহিকতায় আউট হয়ে ফিরলেন মুমিনুল হক। লাঞ্চের আগে ঢাকা টেস্টের ইনিংসের ৩৪তম ওভারের এক বল বাকি থাকতেই ফেরেন তিনি। ৪৬ বলে ২৯ রান করে কেমার রোচের বলে রোস্টন চেজের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান।

টপ অর্ডারে দুই ব্যাটসম্যান আউট হলেও দুর্দান্ত ব্যাটিং করছিলেন অভিষিক্ত সাদমান। ধীরেসুস্থে বড় করেছেন নিজের ইনিংস। সেইসাথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন দলকে। অভিষেক টেস্টে পূরণ করেছেন নিজের প্রথম অর্ধশতক। দলীয় ১৫১ রানের মাথায় দেবেন্দ্র বিশুর বলে বোল্ড হন ২৯ রান করা মিঠুন। দলীয় ১৬১ রানের মাথায় বিদায় নেন অভিষিক্ত সাদমান ইসলাম (৭৬)। ১৯৯ বল মোকাবেলা করে ছয়টি বাউন্ডারিতে এই ইনিংস সাজান বাঁহাতি ওপেনার। অভিষেক ম্যাচেই দুর্দান্ত ব্যাটিং করে জাত চেনালেন তিনি। সেই সাথে ব্যাটিং করলেন পুরোদস্তুর টেস্ট মেজাজে। শুরু থেকেই তার ধৈর্যশীল ব্যাটিং এর প্রশংসা করেছে সবাই। তার ব্যাটিং স্টাইল হুবহু তামিম ইকবালের মত। কিন্তু অভিষেক ম্যাচে ১৯৯ বলে ৭৬ রানে আউট হয়ে ফেরার আগে বাংলাদেশের হয়ে করে গেছেন ছোট একটি রেকর্ড। যেখানে পিছনে ফেলেছেন টাইগার সাবেক ওপেনার জাভেদ ওমর বেলিমকে।

তৃতীয় সেশন শুরুর কিছুটা সময় পর বিদায় নেন মুশফিক। দলীয় ১৯০ রানের মাথায় বাংলাদেশ পঞ্চম উইকেট হারায়। লুইসের বলে বোল্ড হওয়ার আগে মুশফিকের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ১৪ রান। এরমধ্যেই দারুণ এক মাইলফলকে পৌছে গেলেন মুশফিক। চট্টগ্রাম টেস্টে একটুর জন্য যা করতে পারেননি, তা করলেন ঢাকা টেস্টে। দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ৪ হাজার রান হয়ে গেল মুশফিকুর রহিমের। এর আগে এই কীর্তি ছিল শুধু তামিম ইকবালের।

এরপর অধিনায়ক সাকিব আর মাহমুদউল্লাহর ব্যাটেই প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশ ৫ উইকেট হারিয়ে ২৫৯ রান তুলেছে।

এই ম্যাচের মধ্যদিয়ে টেস্টে অভিষেক হলো তরুণ ব্যাটসম্যান সাদমান ইসলামের। বিশ্রামে রাখা হয়েছে ওপেনার ইমরুল কায়েসকে। বাদ পড়েছেন পেসার মোস্তাফিজুর রহমান, দলে এসেছেন লিটন দাস। এই প্রথম কোনো পেসার ছাড়া মাঠে নেমেছে টাইগাররা।

বাংলাদেশ একাদশ:

সাদমান ইসলাম, সৌম্য সরকার, মুমিনুল হক, মোহাম্মদ মিঠুন, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, তাইজুল ইসলাম এবং নাঈম হাসান।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ একাদশ:

ক্রেইগ ব্রাথওয়েইট, কাইরন পাওয়েল, শাই হোপ, শিমরন হেটমেয়ার, সুনীল অ্যামব্রিস, রোসটন চেজ, শেন ডরউইচ, শিমরন লুইস, দেবেন্দ্র বিশু, কেমার রোচ এবং জোমেল ওয়ারিকান।