ঢাকা শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

মন ছুটে যায় কাবার পানে


|| প্রকাশিত: 9:57 pm , July 8, 2019

আহনাফ আবদুল কাদির: হাজীরা ছুটছে কাবার পথে। দু’চোখে তাদের কাবার ছবি। হৃদয়জুড়ে ভক্তি, ভালবাসা আর প্রেমের ঢেউ। পৃথিবীর সব প্রেম, সব ভালোবাসা তুচ্ছ এ প্রেমের আঙ্গিনায়।

মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার এক গভীর আকর্ষণ অনুভূত হাজীদের দেহ-মনজুড়ে। পাগলপারা হয়ে ছুটছে হাজীরা, পবিত্র সেই ভুমির পথে।

কিন্তু কেন এই আকুলতা! হৃদয় জুড়ে এত ব্যাকুলতা! এই ব্যাকুলতা যে প্রেমের, ভালবাসার। প্রভুর আদেশ মেনে, তার সঙ্গে তার গৃহে এসে দেখা করার চেয়ে বড় সুযোগ আর কিইবা হতে পারে। এত মহান নেয়ামতের সামর্থ্য যাদের আছে সত্যিই যে তারা সৌভাগ্যবান।

কত স্মৃতি মিশে আছে এই ঘরকে ঘিরে। পৃথিবীর আদি এই পবিত্র ঘরটি সেদিন নবী নুহের (আ.) সময় মহাপ্লাবনে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর, মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.) স্বীয় পুত্র ইসমাঈলকে (আ.) সঙ্গে নিয়ে পুনঃনির্মাণ করেন।

তারপর রবের নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) সেই ঘর তাওয়াফের, হজের ঘোষনা দিলেন। কোরআনের ভাষায়, ‘দিয়ে দাও মানুষের কাছে হজের আজান। তারা চলে আসবে পায়ে হেটে-হেটে। কিংবা ক্ষীনকায় উটের পিঠে আরোহী হয়ে, ছুটে আসবে তারা দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে”(সুরা হজ: ২৭)।

ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে যুবাইর (রা.) বলেন, ‘ইবরাহিমের (আ.) সেই হজের আজান ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে বিশ্বজাহান ছাড়িয়ে রুহের জগত পাড়ি দিয়ে সকলের কানে পৌঁছে গেল। সেই ঘোষনা পৌঁছে গেল যারা ছিল মায়ের গর্ভে আর বাপের পিঠে তথা রুহের জগতে সর্বত্র। সেই হৃদয়ছোয়া আহ্বানে সাড়া দিল প্রত্যেক পাহাড়-পর্বত, গাছপালা, তরুলতা সবকিছু। কেয়ামত পর্যন্ত যাদের ভাগ্যে আল্লাহ হজ রেখেছেন সবাই সমস্বরে লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক বলে উঠল (তাফসিরে তাবারি: ১৭/১০৬)।

আল্লাহর পথের মেহমান ও যাত্রীদের হৃদয়ের অ্যালবামে একে-একে ভেসে উঠে পবিত্র নগরী বায়তুল্লাহ, মিনা, মুজদালিফা, সাফা-মারওয়া, মাকামে ইব্রাহিম আর আরাফা ময়দানের নয়ন জুড়ানো সেই দৃশ্যাবলি।

পবিত্র নগরী মক্কা মোকাররামা। পৃথিবীর আদিভূমির এই ঘরকে কেন্দ্র করেই সর্বপ্রথম বেজে উঠেছিল আল্লাহর একত্ববাদের দামামা। সৃষ্টির সূচনা থেকেই এটি নিরাপদ ও নিরাপত্তার প্রতীক। বিশ্ববাসীর জন্য কল্যান, প্রাচুর্য ও আলোর দিশারি।

পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘অবশ্যই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ নির্মিত হয়েছিল, তা মক্কায় অবস্থিত; যা বরকতময় ও পৃথিবীবাসির জন্য পথের দিশারি। এতে রয়েছে অনেক সুস্পষ্ট নিদর্শন ও মাকামে ইবরাহীম। যে কেউ সেথায় প্রবেশ করে, সে নিরাপত্তা লাভ করে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মানুষের উপর হজ করা একান্ত আবশ্যক; সেখানে যাওয়ার সামর্থ যে রাখে, তার জন্য এই বিধান। আর যে অস্বীকার করে, সে জেনে রাখুক আল্লাহ পৃথিবীবাসীদের কাছে অমুখাপেক্ষি (সুরা আল-ইমরান: ৯৬-৯৭)।

সহিহ হাদিসে রাসুল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবি আবু যার গিফারি (রা.) জিজ্ঞেস করেন, হে রাসুল! এই পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম কোন মসজিদটি নির্মিত হয়?

জবাবে তিনি বলেন, মসজিদে হারাম বা কাবাঘর। সাহাবি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কোনটি? হে রাসুল! জবাবে রাসুল (সা.) বলেন, এর চল্লিশ বছর পর নির্মিত হয়েছে বায়তুল মুকাদ্দাস’(মুসনাদে আহমদ: ৫/১৫০, বুখারি: ৩৩৬৬ ও মুসলিম: ১/৩৭০)।

কিয়ামত পর্যন্ত এটি শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হবে। অশান্তির দাবানলে পুড়ে-পুড়ে ছাই আজকের এই বিশ্ব সভ্যতার ভেতরে বাহিরে কোথাও নেই শান্তির পরশ। তাই বিশ্বাসী বান্দারা আত্মার প্রশান্তি লাভের নিমিত্তে ব্যাকুলপানে ছুটে আসেন পবিত্র এই কাবার প্রান্তরে।

হাজার-হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নিজেকে সপে দেন প্রেমের দরিয়ায়, প্রভুর কাছে। মহান রবের ঘরে এসে, রবের দরবারে হৃদয়ের সব জানালা খুলে দিয়ে নিজেকে নিবেদন করেন। কাবার ওপর অবারিত ধারায় বর্ষিত রবের রহমতের ফোয়ারা নেমে আসে পাগলপারা ঈমানদার হাজীর উপর। আকুল আবেদনে সিক্ত হয় হাজিদের দু’চোখ। রুহের জগতে শোনা সেই আহ্বান আবারো কানে বেজে উঠে।

ঈমানদার হাজী অশ্রুসজল চোখে আবারও বলে উঠে, ‘হাজির! প্রভু হে হাজির আমি, তোমার দরবারে। তোমার কোন শরিক নেই। চোখের অশ্রুতে ধুয়ে মুছে সাফ হতে থাকে হৃদয়ের সব কলুষতা। সূত্র‍ঃ যুগান্তর