ঢাকা সোমবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২১

কোচিং বাণিজ্যই কি শেষ কথা?


|| প্রকাশিত: 9:32 pm , June 14, 2019

সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে শিক্ষাসহ নাগরিকদের জীবনধারণের অন্যান্য মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষাকে খুব সুন্দর করে জীবন ধারণের মৌলিক একটি বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হলেও রাষ্ট্র কি সত্যিই শিক্ষা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর তদরূপ গুরুত্ব দিচ্ছে?এই প্রশ্ন করার অপরাধে আমাকে যদি বলা হয় হাজার হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিরাট বিরাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজ, জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ এ প্লাস এগুলো কি আপনার চোখে পড়ে না? চোখের ডাক্তার কতদিন দেখান না?আপনি কি সরকার বিরোধী? তবে আমি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলবো বর্তমান শিক্ষাবান্ধব সরকারের এসব কাজের আমি প্রশংসা করি। আমি শিক্ষকদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক সুবিধা বৃদ্ধির যে চেষ্টাটা বর্তমান সরকার করে যাচ্ছে সেটারও প্রশংসা করি চিৎকার করে। যে চিৎকার শুনে আমার অনেক সহকর্মী বাঁকা চোখে তাকিয়ে মাঝেমধ্যে বলেও বসে শিক্ষক সমাজের প্রতি সরকারের এত আন্তরিকতা যে চিৎকার করে বলে বেড়াও, এই সরকার যে আমাদের স্বাধীনভাবে লেখালেখির ওপরে কি একটা আইন করে খড়গ চেপে ধরেছে সে ব্যাপারে কিছু বলো না কেন? আমি চুপ করে থাকি আর মনে মনে বলি,দুই বাংলার জনপ্রিয় মানবতাবাদী কবি হেনরি স্বপনের মতো লোক দু লাইন লিখে চৌদ্দ শিকের আতিথেয়তা গ্রহণ করে আসলো আর সেখানে আমিতো চুনোপুঁটি ! চুপ থাকি, কথায় আছে বোবার কোনো শত্রু নাই।

কিন্তু চুপ থাকতে পারি না যখন আমার ছোট ছোট ভাইপো-ভাইজী কে দেখি ইয়া বড় বড় ব্যাগ নিয়ে সারাটাদিন ক্লান্ত হয়ে এই কোচিং থেকে সেই কোচিংএ দৌড়াদৌড়ি করে। ওদের সুন্দর শৈশবকে গলাটিপে মারা কোচিং সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করার তীব্র ইচ্ছা জাগে। যদিও দেশের বর্তমান সরকার তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সকল ধরণের পরীক্ষা বাতিল করার মতো অসম্ভব সুন্দর একটা নীতিগত সিদ্ধান্তে এসেছে তবুও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আনন্দময় শৈশব হত্যাকরা কোচিং সেন্টারগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকান্ড আমাকে নির্ভাবনায় থাকতে দেয় না! এর যথেষ্ট কারণও আছে। দেশের কোচিং বিদ্যার হর্তাকর্তারা অভিভাবকদের বিশ্বাস করাতে সফল হয়েছে যে শ্রেণীকক্ষে আসলে পড়াশোনা হয় না। এক্ষেত্রে স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বিভিন্ন কোচিং এর সঙ্গে যুক্ত হবার ব্যাপারটাও অভিভাবকদের কোচিং ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহী হতে বেশি সাহায্য করেছে।শৈশব হত্যা করা ওইসব শিক্ষককে আমি খুনী বলে মনে করি এবং মন থেকে ঘৃণা করি।

কোচিং সেন্টার এবং শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করা শিক্ষকবৃন্দ শুধু যে শৈশব জীবন নষ্ট করছে তেমন না। তারা পুরোপুরি একটা স্বার্থপর, অসামাজিক, বিবেকহীন, শত্রুভাবাপন্ন ও অনুপ্রেরণাহীন জাতি আমাদের উপহার দিচ্ছে। একটি শিশু সারাটাদিন কোচিং সেন্টারগুলোয় দৌড়াদৌড়ির ফলে যে অতি প্রতিযোগীতামূলক অবস্থায় বেড়ে উঠছে সেটা তাকে স্বার্থপর হিসেবে গড়ে তুলছে। কোচিং-এ ব্যস্ত থাকা শিশুটি সাধারণ সামাজিকতা কিংবা খেলাধুলার পরিবেশ থেকে স্বভাবতই দূরে থাকছে। খেলাধুলা কিংবা সামাজিকতার যেসব উপকারিতা যেমন : দলবদ্ধভাবে কাজ করা, দল বা সমাজের অন্য সদস্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা, খেলাধুলায় জয়ের লক্ষ্য অর্জনের পথে স্বাভাবিক বাঁধা গুলো অতিক্রমে তীব্র পরিশ্রম করা (যেটা মানুষের পরবর্তী জীবনেও অনেক কাজে লাগে), হার মেনে নেবার সাধারণ মানসিকতা (যেটার অভাবে বর্তমান প্রজন্ম একটু দুঃখেই আত্নহত্যার মতো ভয়ংকর পথ বেঁছে নিচ্ছে লজ্জা এড়াবার জন্য) ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শুধুমাত্র কোচিং ব্যবস্থার দাপটের কারণে। এসব কোচিং সেন্টার গুলো এ প্লাস পাবার তীব্র প্রতিযোগীতাকে আরো তীব্র করে দিয়েছে তাদের বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের চতুরতা দিয়ে। এসব চতুরতার ফলে ফলাফল পরবর্তী সময়ে কোচিং সেন্টারগুলোর বিজ্ঞাপনের মুখ হয়ে ওঠা শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই শত্রু হয়ে ওঠে একটু খারাপ ফল করা শিশুদের (কারণ অভিভাবক ও শিক্ষকবৃন্দ খারাপ ফলাফল করা শিশুদের সামনে বারবার বিজ্ঞাপনের শিশুদের উদাহরণ হিসেবে দেখিয়ে একধরনের নির্মমতায় অংশ নেয়) । এবং শিশুদের এই শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব পরবর্তী জীবনেও প্রভাবিত করে রাখে তার চরিত্রকে। কোচিং সেন্টারগুলোর দাপটে শিশুবয়সেই শিল্প – সাহিত্য,ধর্মীয় কিংবা একাডেমিক শিক্ষার বাইরের অন্য অজানা কিন্তু জীবনযাপনে উপকারী শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠছে আমাদের বাচ্চারা।যেটার ফলাফল হচ্ছে বিবেক ও রুচিহীন প্রজন্মের সৃষ্টি।

কোচিং সেন্টারগুলো শুধু যে মানসিকভাবে ক্ষীণ জাতি উপহার দিচ্ছে সেটা নয়, অর্থনৈতিক ভাবেও ক্ষতি করছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন শ্রেণীর পরিবারগুলোর। সরকারি সূত্রমতে , শিক্ষা ব্যয়ের ৩০ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে কোচিং এর পেছনে। পরিসংখ্যান ব্যুরো পরচিালিত জরিপ থেকে জানা গেছে, একজন শিক্ষার্থী বছরে তার শিক্ষার পেছনে যে টাকা ব্যয় করে তার মধ্যে ৩০ শতাংশ চলে যায় কোচিং আর হাউজ টিউটরের ফি বাবদ। এটা সরকারি হিসাব, বাস্তবতা এর চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে। এটাতো গেলো স্কুল -কলেজের সময়টাতে কোচিং সেন্টারগুলোর ভয়াবহ থাবার কথা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কিংবা ইন্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার দেশজোড়া যে কর্পোরেট কোচিং বাণিজ্য সেটার কথা! শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করা ঢাকার ফার্মগেট কেন্দ্রীক বাণিজ্যভান্ডার গুলো সারাদেশের বিভিন্ন জেলা – উপজেলাতে পর্যন্ত তাদের শাখা দোকান খুলে বসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চশিক্ষার ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে নূন্যতম পাশ মার্কসই কোচিংকরা অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা তুলতে পারে না। কোচিং সেন্টারগুলোর প্রদানকরা টোটকা-ওষুধ (কোচিং সেন্টারগুলোতে কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না বলেই আমি বিশ্বাস করি) যে আদতে ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া কিচ্ছু নয় সেটা এসব ভর্তি পরীক্ষাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও প্রখ্যাত অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক সাহেব বলেছিলেন, কোনো সমাজ কতটা আধুনিক, শিক্ষানুরাগী ও রুচিশীল সেটা সে সমাজের বইয়ের দোকানগুলো দেখলে বোঝা যাবে। আমাদের সমাজের বইয়ের দোকানগুলোতে ঢুকলে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ – নজরুল ঢাকা পড়ে আছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারগুলো কর্তৃক প্রণীত টোটকার সাপ্লিমেন্ট, ত্রিশ দিনে হিন্দি ভাষা শিক্ষা কিংবা রোমান্টিক এসএমএস লেখার ১০১ পদ্ধতির বইতে! তবে কি ধরে নিতে হবে নষ্টদের দখলে চলে যাওয়া বর্তমান এ সমাজে কোচিং বাণিজ্যই শেষ কথা?

স্কুল – কলেজের শিক্ষকদের কোচিং করানোর ওপর কদিন আগে জারিকৃত সরকারি নিষেধাজ্ঞার খবরে অনেকে ছিঁচকাঁদুনী হয়ে বলে উঠেছিলেন কটা টাকাই বা তারা বেতন পান? একটু কোচিং করালে কি এমন ক্ষতি হয়! ক্ষতি যে কতটা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তার হিসেব তো উপরেই দিলাম, তারপরও যদি টাকা উপার্জনই শিক্ষকদের কোচিং সেন্টারগুলোয় হুমড়ি খেয়ে পড়ার একমাত্র কারণ হয় তবে তাদেরকে আমি অনুরোধ করবো প্লিজ আপনারা শিক্ষকতা ছেড়ে দিন। নিজ নিজ যোগ্যতায় অন্য পেশায় যান এবং অর্থ, যশ, খ্যাতি অর্জন করুন । একটা প্রতিষ্ঠানের সকল বিষয়ের শিক্ষকরা কিন্তু কোচিং ব্যবসায় জড়িত হতেও পারে না কারণ নির্দিষ্ট কিছু বিষয়গুলোকেই কোচিং সেন্টারগুলোয় গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে ব্যবস্থায় অন্ন সংস্থান করতে গিয়ে আপনি পুরো জাতিকে বিপদগামী করবেন সেই অন্ন কিভাবে একজন বিবেকবান মানুষের গলা দিয়ে নামে সেটা ভেবে অবাক হই! নোবেল জয়ী বাঙালী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি কথা এখানে উল্লেখ করতে হয়, তিনি বলেছিলেন, “শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়, এটা একটি ব্রত”। আর সৎ ব্রতপালন কোনো অর্থলিপ্সু গোষ্ঠী দ্বারা সম্ভব হয় না।তাই রাষ্ট্র এবং সরকারের উচিত শিক্ষাক্ষেত্রের এই অশুভ ছায়া কে বিতাড়িত করতে যেকোনো ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র পিছপা না হওয়া।

লেখক : শফিক মুন্সি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ