ঢাকা বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধে শিক্ষার্থীরা যেসব যুক্তি দিলেন


|| প্রকাশিত: 2:44 pm , October 12, 2019

ফাইলফটো

পিনিউজ২৪ ডেস্ক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ক্যাম্পাসে স্থায়ীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টায় বুয়েটের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনায় বসে এ ঘোষণা দেন বুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। একই সঙ্গে বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতিও করা যাবে না বলেও জানিয়ে দেন তিনি।

গত ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের দুটি কক্ষে নিয়ে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের কমীর পিটিয়ে হত্যা করে শিবির সন্দেহে মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে।

এ ঘটনায় প্রায় এক সপ্তাহ ধরে উত্তাল বুয়েট। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি জানাতে থাকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

সেই দাবির ভিত্তিতে শুক্রবার বুয়েট ক্যাম্পাসে স্থায়ীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা দেনে ভিসি সাইফুল ইসলাম।

বুয়েট ক্যাম্পাসে কেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রয়োজন, সেই প্রশ্নের আবরারের সহপাঠীরা বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা আমাদের দাবি না। আমাদের দাবি হচ্ছে, শুধু বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ।’

ব্যাখ্যা দিয়ে তারা বলেন, ‘ বুয়েটে ভর্তি হওয়ার ছাত্ররাজনীতির উপকারিতা বলতে সর্বসাকুল্যে দুটি পেয়েছি আমরা। প্রথম উপকারিতাটি হচ্ছে- ছাত্রদের দাবি-দাওয়ার কথাগুলো বলতে পারা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদান, যাতে ভবিষ্যতে নেতা গড়ে উঠতে পারে।

কিন্ত এ দুই উপকার অন্যভাবেও পাওয়া যাচ্ছে বলে দাবি করে তারা বলেন, এই দুই উপকার পেতে বুয়েটে আমাদের ছাত্ররাজনীতি করার দরকার নেই। এর ক্ষতির যে ব্যাপকতা তা বলে শেষ করা যাবে না। তাই বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে আমরা।

বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করে বলেন আবরার ফাহাদের ব্যাচের এক শিক্ষার্থী।

তিনি বলেন, আমাদের দাবি-দাওয়া উত্থাপনের জন্য অনন্ত বুয়েটে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন নেই। কারণ খুব বেশি হলে বুয়েট পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর একটা ক্যাম্পাস। বুয়েটের প্রতিটি ক্লাসে সিআর (ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ) আছে। পাশাপাশি প্রতিটা অনুষদের নিজস্ব অ্যাসোসিয়েশন আছে। অ্যাসোসিয়েশন রিপ্রেজেন্টেটিভ (এআর) আছে। হল রিপ্রেজেন্টেটিভ, ব্যাচ রিপ্রেজেন্টেভি – এমন বিভিন্ন পদ আছে। এসব পদ নির্বাচিত। শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া বলার মতো আমাদের এমন শক্তিশালী একটি প্লাটফর্ম আছে। তাই কাজেই আমাদের দাবি-দাওয়ার কথা বলার জন্য ছাত্ররাজনৈতিক সংগঠন অতটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে আমরা মনে করি না।’

এভাবে প্রথম কারণের ব্যাখ্যা দেন সেই ছাত্র। তার সেই ব্যাখ্যায় সহমত জানান বুয়েটের অন্যান্যরাও।

এবার দ্বিতীয় কারণের ব্যাখ্যা দিয়ে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির উদ্দেশ্য রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদান। পুরো বিষয়টি রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিক। ষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলো আমাদের নেই। বুয়েট একটা টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং শেখানো হয়। বুয়েটে যেসব বিষয় শেখানো সেগুলো এতোটাই গভীর যে ভালো ফলাফল করতে বা গবেষণামূলক কাজ করতে গেলে এসব রাজনীতিতে না জড়ানোই ভালো। যারা বিজ্ঞানী হবেন তারা কেন নোংরা, কাঁদা ছোড়াছুড়ির রাজনীতিতে মননিবেশ করবেন? এতে সৃজনশীলতা হ্রাস পাবে আমাদের।

তবুও নীতি-নির্ধারণী তৈরিতে রাজনৈতিক শিক্ষা প্রয়োজন স্বীকার করে তিনি বলেন, দেখুন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশেই ছাত্ররাজনীতি নাই। তারপরও সে দেশের মানুষরা দেশ চালাচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন। বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো চতুরতার সঙ্গে তারা সামলাচ্ছেন।

বুয়েট শিক্ষার্থীরা যুক্তি দেখান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, এমআইএসটি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যাচ্ছে। বুয়েট থেকে আলাদাভাবে একজন মানুষ কী এমন একটা পর্যায়ে যাবে, যে জিনিসটা শেখাতে এখন থেকেই এরকম একটা নোংরা রাজনীতির মধ্যে আনতে হচ্ছে।

তাই শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা দরকার। কেউ ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক দল সমর্থন করলে করতে পারে। এটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার, এটা নিয়ে তাদের কোনো সমস্যা নাই।’

শিক্ষার্থীরা আরও যুক্তি দেখান, ‘এখন পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতির শুধু মিস ইউজ (অপব্যবহার) হয়েছে। এটা শুধু এ ক্যাম্পাসে খারাপ প্রভাব ফেলেছে, আর কিছুই হয় নাই। দলীয় স্বার্থে খুনখারাপি হয়েছে। যার বলি হলেন আবরার ফাহাদ। তাই আমরা মনে করি, ছাত্র রাজনীতি বুয়েটে প্রয়োজনীয় নয়।’

বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন প্রসঙ্গে গত বুধবার বিকালে গণভবনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং ভারত সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্ররাই সব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় থাকে। আমিও ছাত্ররাজনীতি করেই এখানে এসেছি। এখন একটা ঘটনা ঘটেছে বলেই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে কেন? তবে বুয়েট চাইলে সেখানে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে। আমরা এতে হস্তক্ষেপ করব না।

এরপরই শুক্রবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বুয়েটে স্থায়ীভাবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার কথা জানালেন ভিসি ড. সাইফুল ইসলাম।

প্রসঙ্গত ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় খুন হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে শনিবার বিকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে রোববার রাতে শেরেবাংলা হলের নিজের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে ২০১১ নম্বর কক্ষে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পিটুনির সময় নিহত আবরারকে ‘শিবিরকর্মী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালায় খুনিরা।

তবে আবরার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে নিশ্চিত করেছেন তার পরিবারের সদস্যসহ সংশ্লিষ্টরা।

হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ না রাখতে সিসিটিভি ফুটেজ মুছে (ডিলিট) দেয় খুনিরা। তবে পুলিশের আইসিটি বিশেষজ্ঞরা তা উদ্ধারে সক্ষম হন। পুলিশ ও চিকিৎসকরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পেয়েছেন।

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে চকবাজার থানায় ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইতিমধ্যে অমিতসহ ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ১৩ জনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

গ্রেফতার আসামিরা হলেন- বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফুয়াদ হোসেন, অনীক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশারেফ, বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে রবিন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, ছাত্রলীগের সদস্য মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম ওরফে তানভীর, মোহাজিদুর রহমানকে, শামসুল আরেফিন, মনিরুজ্জামান ও আকাশ হোসেন, মিজানুর রহমান (আবরারের রুমমেট), ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহা এবং হোসেন মোহাম্মদ তোহা।

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ