ঢাকা সোমবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২১

রাষ্ট্রের দায় : লকডাউন বনাম ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী


|| প্রকাশিত: 3:20 pm , April 19, 2020

এক.

গত ১১ এপ্রিল বাঞ্ছারামপুরের এক নারী করোনা আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় মারা যাওয়ায় ওইদিনই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা জোবায়ের আহমদ আনসারীর এত বড় একটা জানাজা হইল, যা আমাদের ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত করেছে।

সেইসঙ্গে আমাদের ধর্মীয় চিন্তা ও মূল্যবোধকে কাঠগড়ায় তুললাম, তাও আবার নির্দিষ্ট এলাকা বা আঞ্চলিকতাকে আঙুল তুলে। যেন, ওই অঞ্চলের মুসলমানেরাই এই কাজ করছে, আমরা হইলে এরকম করতাম না। অথচ গত এক মাস ধরে, পুরো দেশে কী ঘটতেছে- করোনা আক্রান্ত তো আছেই এমনকি যার করোনাও হয়নি তাকেও কবর দিতে দিচ্ছে না এসব ‘ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী’, জানাজা পড়তে দিচ্ছে না, দাফনের জন্য খাটিয়া দিচ্ছে না।

কী জন্য? নিজেদের নিরাপত্তা আর সুরক্ষার জন্য এমন অমানবিক হয়েছেন তারা। অথচ ‘আল্লাহ থাকতে করোনার ভয় নাই’ এমন চিন্তা নিয়ে মসজিদে যাইতেও তারা উদগ্রীব। মসজিদ লকডাউন করলেও তারা ঠিকই জামাতে যাইতেছেন, গ্রামে-গঞ্জে ঠিকই সব চলতেছে। আবার পাশাপাশি কেউ মারা গেলে এসব কর্মকাণ্ড তারা করতেছেন। কী অদ্ভূত৷ পুরা দেশের এই চিত্র হাজিরানায় রাইখা আজকে আমরা একটা অঞ্চলের মুণ্ডুপাত করতেছি। ধাপে ধাপে হিপোক্রেসি আর কাউন্টার হিপোক্রেসিটা বুঝতেছেন!

দুই.

পুরো ব্যাপারটিই খেয়াল করেন, ওনারা যে জানাজায় গেলেন, তারা আসলে করোনাকে পাত্তা দিতেছেন না। কী কারণে, তা হলো ঈমানি বিশ্বাস৷ যেই ঈমানি বিশ্বাস আমরা শুরুতে সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যেও দেখেছি- ‘প্রধানমন্ত্রী থাকতে করোনার ভয় নাই, করোনা সামান্য সর্দি-কাশি, বাংলাদেশের কিছু করতে পারবে না।’ হুজুরদের মতো অনেক মানুষের সামনে ঘটা করে কয়েকজন মন্ত্রী একাধিকবার সেটা বলে গেলেন। তারাও পাত্তা দিলেন না, কারণ তাদের চেতনার কমজোরি নিয়ে তারা আদৌ জানেন না, ঠিক যেমন জানাজায় যাওয়া ওই লোকগুলোরই এপিট-ওপিট। যার ফলাফল আপনি দেখবেন, করোনায় মোকাবিলায় সরকারের গলদটা কোন জায়গায়। যেইটা ওনারা এখনো স্বীকার করতেছেন না এবং একটা বড় বিপর্যয়ের ভুক্তভোগী আমরা হইতে যাচ্ছি। যার জন্য আমরাও সমানভাবে দায়ী।

তিন.

এমন একটা ভয়াবহ মহামারীর কালে দেখেন, রাষ্ট্র সরকার জনগণ- কী অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা ও সমন্বয়হীনতার মধ্যে এতকাল আমরা আছি। বিপর্যয় সামাল দিতে আমরা কোনোভাবেই প্রস্তুত না। আমাদের সেই ক্যারেক্টার নাই আসলে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সেই ক্যারেক্টার তৈরি হলেও গত ৫০ বছরে সেটা একটু একটু করে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে পরিবারতান্ত্রিক গণতন্ত্রে বন্দী হয়ে। মাজার বা পীরের অনুসারীর মতো আমরাও নির্দিষ্ট পরিবারের প্রতি আমাদের সব কিছু বন্ধক রেখেছি। যার ফলে আমাদের এখন কোনো মেরুদণ্ড নাই। আমাদের চিন্তা, দেশত্ববোধ, সমাজবোধ, রাষ্ট্র কিংবা মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ সবকিছুই লাগামছাড়া। এর মধ্য দিয়ে আমরা ভোট দেয়ার অধিকারও হারিয়েছি, যেটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধানতম মৌলিক অধিকার। আমরা বুঝতে শিখছি সেইসঙ্গে আমাদের বুঝিয়েও দেয়া হয়েছে- এই রাষ্ট্র দেশ আর সমাজের প্রতি আমাদের কোনো দায় নেই। ফলে এসবের ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়েছে ধর্মচেতনা নামে উদ্ভট সব চর্চা, যেটার সঙ্গে আপনি কয়েক দশক আগে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা মানবিকতার যে চর্চা ছিল এই দেশে, সেটার সঙ্গে রিলেট করতে পারবেন না।

যার ফলে মায়ের পায়ের নিচে যে সন্তানের বেহেশত, সেই সন্তান তাকে করোনা আক্রান্ত সন্দেহে জঙ্গলে ফেলে আসার ঘটনা ঘটতেছে। এইখানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার যে ভীতি সন্তানকে এই কাজ করতে বাধ্য করছে সেইটা অন্য আলাপ। কিন্তু এরপরও এই ঘটনাকে আমাদের ফেস করতে হলো, যেটি পৃথিবীর কোথাও ঘটেনি। এমনটি ঘটবে সেটা আমরা জীবনেও কখনো আশা করিনি, যেখানে গ্রামে গ্রামে ওয়াজ মাহফিলে হুজুররা নিয়মিতই ‘মায়ের একধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের ছাম’ এই গান শোনাইয়া মানুষের চোখের পানি ফেলান আর ‘মা মা মা’ বলে আহাজারি করেন। এখানে আবার কিন্তু ‘ধর্মপ্রাণ এলাকাবাসী’র কেউ ওই মাকে বাঁচিয়েছিলেন। যেটার জন্য এত কিছুর পরও আমরা আশাবাদী হইতে চাই।

চার.

আনসারী সাহেব অনেক বড় আলেম, তার অনেক জনপ্রিয়তা, অনেক খ্যাতি। শুক্রবার বিকেলে তিনি জেলা শহরে নিজের বাসাতেই মারা গেছেন। তার মৃত্যুর সংবাদ সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশ হয়েছে। যেখানে দেখলাম রাজনৈতিক নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, সামাজিক সংগঠন- অনেকেই তার প্রতি শোক প্রকাশ করেছেন। রাতেই তার জানাজার সময় আর স্থান ঘোষণা করা হয়। যার কারণে অনেক মানুষ ঢাকা থেকে শুরু করে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে এই লকডাউনের মধ্যেই পায়ে হেঁটে হইলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে হাজির হলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেখানে নিজেও লকডাউন। স্বাভাবিকভাবেই এই জনস্রোত কোনোভাবে প্রশাসনের সাধ্য ছিল না মোকাবিলা করার। জনগণের চরিত্রই এটা। যার কারণে ফ্লোরিডার সি বিচে হাজার হাজার মানুষের ভিড়, দক্ষিণ ভারতে হিন্দুদের তীর্থযাত্রা। সরকার কিংবা প্রশাসন অনেক সময় জনগণের এই চরিত্রের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।

আফসোস থেকে বলছি, এরপরেও কি সম্ভব ছিল না এই জানাজাকে আটকে দেয়া বা সীমিত আকারে রাখা? যেভাবে সম্ভব ছিল গার্মেন্টস কর্মীদের ঢাকা আসা, কয়দিন ধরে তাদের বিক্ষোভ, স্কুল ছুটির আগে পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়া। স্থানীয় প্রশাসন আন্তরিক হয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক সংগঠন, মৃতের পরিবার, মাদ্রাসার পরিচালকগণ, আলেম ওলামা, নিরাপত্তা বাহিনী সবার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারত শুক্রবার রাতেই। কিন্তু তারা সেটা করেন নাই।

ওই অঞ্চলের এতবড় একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মারা গেলেন, তার জানাজায় এভাবে ঢল নামবে সেই ব্যাপারে কোনো গোয়েন্দা সতর্কতাও ছিল না বা থাকলেও, তারা যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ছাড়া এক পা এগোন না- সেজন্য এই ব্যাপারটিকে পাত্তা দিলেন না! অথচ কঠোর কিংবা পদক্ষেপ নিলে দ্রুত ঢাকার সঙ্গে সমন্বয় করে এই পরিস্থিতি রোখা যেত, এমনটাও অনেকে বলতেছেন। জাতীয় নির্বাচন, এর বাইরেও কত কত নির্বাচন, কত কত আন্দোলন নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে গিলে খেয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা সরকারের ছিলই। অনেকেই এখন ডাক্তারদের পেছনে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে, কোন হাসপাতালে কী হইতেছে না হইতেছে, কে কখন আসতেছে না যাইতেছে, কে কাকে কী বলতেছে, প্রতিদিনের হাজিরা খাতায় নাম আছে কী না, সেটাও এখন গোয়েন্দাদের প্রধানতম কাজ হয়ে দাঁড়াইছে। এইভাবে ওনারা মহামারি মোকাবিলা করতেছেন। ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঘটনাও কিন্তু রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনারই অংশ, এভাবে ভাবাটা কি অমূলক হইবে? এখন আল্লামা শফি অসুস্থ, তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নিয়ে আসা হইছে, এখন যদি তিনি মারা যান। সেটা কীভাবে সামাল দেবেন?

পাঁচ.

আনসারীর জানাজা নিয়ে সরকারের দোষ খোঁজাটা অবশ্যই হাস্যকর, যেহেতু জবাবদিহির কোনো বিষয় নেই। এত গোঁজামিলের মধ্যেও সরকার প্রতিনিয়ত নানাদিক থেকে সামাল দেয়ার চেষ্টা করে যাইতেছে, যেটা আদতে কতটুকু ফল বয়ে আনবে সেটা ভবিষ্যৎই বলে দেবে, যদি না করোনা আমাদের সবাইরে গ্রাস করে ফেলে। লকডাউন কী, লকডাউনের চরিত্র কী, লকডাউন কীভাবে মানা হবে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে, সেইসঙ্গে জনগণের পক্ষ থেকেও সেইটা আমাদের চিন্তাতেও নেই। যার কারণে লকডাউনের সুফল আদৌ আমরা পাব কী না সন্দিহান। নাকি সেটা আরও শাপেবর হয়ে অর্থনৈতিক মন্দা তৈরি করে ক্ষুধায় মানুষ মরার দিকেই নিয়ে যাবে, এ নিয়ে বিস্তর আশঙ্কা আমরা দেখতেছি।

জানাজার ছবিগুলো দেখেই যে কেউ বলবে, এই জনস্রোত কীভাবে মোকাবিলা সম্ভব। এটা আমিও বলতেছি। এই ঘটনা ঘটে গেছে বলে সেই ছবি আমাদের চোখে এখন ভাসছে বলেই বলতেছি, এটা বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বা ঘটনাটিকে সম্ভব হইতে না দিলে বা সীমিত করে দিতে সক্ষম হইলে আমরা আবার বুঝতামও না, কেমন মূর্খতার দিকে চলে গেছি, সেইসঙ্গে হিপোক্রেসি-কাউন্টার হিপোক্রেসির দিকেও। পরকালের ভয় কিংবা বেহেশত পাইবার আশায় দুনিয়াকেও দোজখ বানায় ফেলতে আমরা কসুর করি না।

রাফসান গালিব : সাংবাদিক

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ