ঢাকা মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২০

করোনার টিকা পেতে প্রতিযোগিতায় জড়াচ্ছেন বিশ্বনেতারা?


|| প্রকাশিত: 5:39 pm , May 22, 2020

পিনিউজ২৪ ডেস্ক: করোনাভাইরাস মহামারিতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর ভয়াবহ অর্থনিতক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন বিশ্ব নেতারা। দুনিয়াজুড়ে প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে সোয়া তিন লাখের বেশি মানুষের। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব নেতারা কোভিড-১৯ এর টিকাকেই স্থবির অর্থনীতি পুনরায় সচল করতে মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করছেন। এতে করে টিকা প্রাপ্তির জন্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুরুর কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন তারা। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫১ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। কার্যকর কোনও ওষুধ না থাকায় এই মহামারি মোকাবিলায় টিকার উপরই ভরসা করতে চাচ্ছে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ। সরকার, ওষুধ নির্মাতা ও গবেষকরা প্রায় ১০০টি টিকা উদ্ভাবন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের পূর্বাভাস অনুসারে, নিরাপদ ও কার্যকর রোগ প্রতিরোধী টিকা উদ্ভাবনে ১২-১৮ সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি টিকার মানবদেহে পরীক্ষা হয়েছে। এই পর্যায়ে টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। বেশিরভাগ টিকাই এই পর্যায়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনও কার্যকর টিকা উদ্ভাবিত না হলেও যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে সম্ভাব্য টিকার ৩০ কোটি ডোজ প্রাপ্তির জন্য ব্রিটিশ কোম্পানি আস্ট্রাজেনেকা’র সঙ্গে চুক্তি করেছে। এজন্য কোম্পানিটিকে ১২০ কোটি ডলারের তহবিল দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এছাড়া সম্ভাব্য টিকা পেতে জনসন অ্যান্ড জনসন, মডার্না ও সানোফি’র সঙ্গেও চুক্তি করেছে দেশটি। এতে করে আশঙ্কা জাগছে, প্রথমে ধনীদেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

এই মাসের শুরুতে ফরাসি সরকারের তোপের মুখে পড়েছিলেন সানোফি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বলেছিলেন, তাদের উৎপাদিত টিকা প্রথমেই পাবে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ দেশটি আর্থিকভাবে তাদের গবেষণায় সহযোগিতা করেছে। ফরাসী প্রধানমন্ত্রী এডুয়ার্ড ফিলিপ বলেছিলেন, সবার টিকার প্রাপ্যতার বিষয়টি নিয়ে কোনও আলোচনা হতে পারে না। এরপরই সানোফির চেয়ারম্যান সবার জন্য টিকার সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ব্রিটিশ ওষুধ নির্মাতা আস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই মুহূর্তে টিকা চিকিৎসাবিদ্যা ক্ষেত্রে আমাদের অনেক কিছুই হচ্ছে। আগামী এক বা দুই সপ্তাহে এক্ষেত্রে আপনারা বড় ধরনের ঘোষণা পেতে পারেন।

মিশিগানে ফোর্ড মটর কোম্পানির কারখানা পরিদর্শনের সময় ট্রাম্প আরও বলেছেন, দ্রুত ১৫০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন টিকা দিতে সক্ষমতা অর্জনের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে।

আস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে টিকার প্রাপ্যতা ও উৎপাদন নিয়ে। এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গেও আলোচনা হচ্ছে টিকার ন্যায্য বরাদ্দ ও বিতরণের জন্য। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী পাসকেল সোরিয়ট বলেন, আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এতে করে টিকার উদ্ভাবন ও উৎপাদন গতি পেয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজভিত্তিক আস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, এরই মধ্যে ৪০ কোটি টিকার ডোজ বিক্রির চুক্তি তারা সম্পন্ন করেছে এবং ১০০ কোটি ডোজ উৎপাদনের সামর্থ্য রয়েছে তাদের। সেপ্টেম্বরে প্রথম সরবরাহ শুরু হবে।

আস্ট্রাজেনেকা ব্রিটেনের মানুষকে ১০ কোটি ডোজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৩ কোটি ডোজ প্রদান করবে। ব্রিটিশ মন্ত্রীদের কোম্পানিটি জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যই তাদের প্রথম টিকা পাবে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, তার দেশ করোনার ভ্যাকসিন বানাতে পারলে তা হবে একটি আন্তর্জাতিক পণ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ৭৩ তম অধিবেশনের শুরুর দিনের ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষেরা যেন ভ্যাকসিন থেকে বঞ্চিত না হয়, বেইজিং তা নিশ্চিত করতে চায়।

এর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও নরওয়ে যৌথভাবে করোনা মহামারি মোকাবিলায় তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, গবেষণার পাশাপাশি ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব দেশে টিকা ও চিকিৎসা সামগ্রী বণ্টনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৮২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করবেন বিশ্বনেতারা। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য সেই তহবিলে অর্থ দিতে অস্বীকার করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় সবদেশের জন্য টিকা পাওয়ার সমান সুযোগ থাকতে হবে। ইউরোপিয়ান কমিশনের মুখপাত্র স্টিফান ডি কির্সমায়েকার বলেছেন, কোভিড-১৯ এর টিকা বৈশ্বিক জনগণের পণ্য এবং প্রাপ্যতা সমান ও সর্বজনীন হওয়া উচিত।

বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট করোনার টিকা উৎপাদনের জন্য তাদের একটি কারখানাকে উৎসর্গ করেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি উদ্ভাবিত ও আস্ট্রাজেনেকার লাইসেন্সপ্রাপ্ত টিকাটির বার্ষিক ৪০ কোটি ডোজ উৎপাদন করতে পারবে তারা। আস্ট্রাজেনেকার সঙ্গে আলোচনা চলছে জানিয়ে কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী আদার পানোওয়ালা বলেছেন, আমরা শুরুতে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডোজ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আস্ট্রাজেনেকার এজেডডি১২২২ টিকার নিরাপত্তা, প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য গত মাসে সহস্রাধিক মানুষের দেহে প্রথম/দ্বিতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের ১৮ থেকে ৫৫টি পরীক্ষা কেন্দ্রে পরিচালিত এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল শিগগিরই পাওয়া যাবে।

আস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, আমরা জানি যে টিকাটি কার্যকর নাবো হতে পারে। তবু আমরা দ্রুততার সঙ্গে ক্লিনিক্যাল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছি ও উৎপাদনের ঝুঁকি নিচ্ছি।

অন্যান্য ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ফাইজার, জনসন অ্যান্ড জনসন ও সানোফি টিকা উদ্ভাবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনোভিও ফার্মাসিউটিক্যালস জানিয়েছে, তাদের পরীক্ষামূলক টিকা ইঁদুর ও গিনিপিগে অ্যান্টিবডি ও রোগ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে। আর এই সপ্তাহে মডার্না জানিয়েছে, আট স্বেচ্ছাসেবীর দেহে এ টিকা প্রয়োগের ফল ইতিবাচক হয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষাগুলোও সফল হলে আগামী জানুয়ারি নাগাদ এ টিকা সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে বলে আশা করছে কোম্পানিটি।

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ