ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২০

ক্রিকেটার আলমের সংসার চলছে বরিশালের মাছের আড়তে কাজ করে


|| প্রকাশিত: 5:13 pm , September 7, 2020

সাইফ আমীন, অতিথি প্রতিবেদক: গত কয়েক বছরে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করে বিশ্ব ক্রিকেটে পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। বাংলাদেশ দলের সাফল্যে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের উন্নতির পাশাপাশি দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বেশ উন্নতি করেছে। আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বের পঞ্চম ধনী ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি।

ক্রিকেট খেলে মাশরাফি-সাকিবরাও নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে ক্রিকেটারদের অবস্থান এখন মর্যাদাপূর্ণ। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের আয়ও এখন বেশ ভালো। সর্বোচ্চ বেতন চার লাখ থেকে বেড়ে হয়েছে ছয় লাখ টাকা। সর্বনিম্ন বেতন ৭৫ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ টাকা। বেতনের বাইরে ঘরোয়া ক্রিকেট আর বোনাস থেকেও খেলোয়াড়দের আয় নেহায়েত কম নয়।

ফলে ক্রিকেটারদের অর্থেবিত্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠা এমন কোনো বিস্ময়কর তথ্য নয়। বিস্ময়কর হলো মাশরাফি-সাকিবদের মতো দেশের হয়ে ক্রিকেট খেলেও পরিবারের জন্য দিনে দু’বেলা খাবার জোগাতে মাছের আড়তে কাজ করতে হচ্ছে বরিশাল নগরীর বাসিন্দা আলম খানকে। শুধু তফাৎ একটাই তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

দেশে তো বটেই, বিদেশের মাটিতেও আলম খানের অসাধারণ নৈপুণ্যে বহুবার জয় পেয়েছে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল। ক্রিকেট খেলে বিভিন্ন সাফল্যের পাশাপাশি দেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন তিনি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী দল। যেখানে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের যশ, অর্থ- কোনো কিছুরই অভাব নেই, সেখানে সম্মান প্রতিপত্তি, যশ, অর্থ কোনোটাই জোটেনি আলম খানের।

দারিদ্র্যতার কারণে ক্রিকেট খেলার নেশাটা তার কাছে বিলাসিতার মতো। বাবা কম বকাঝকা করেননি, পিটুনিও খেয়েছেন অনেক। ক্রিকেট ছাড়ার শপথও নিতে হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আলমের মাথা থেকে ক্রিকেটের ভূত নামেনি বরং ক্রমশ বেড়েছে। তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ক্রিকেট। তাই ক্রিকেট খেলেই সংসারের হাল ধরেছেন ৩১ বছরের যুবক আলম।

বাবা কালু খান ছিলেন সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছোট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে বরিশাল নগরীতে খাবার হোটেল চালাতেন কালু খান। ওই দোকানের আয় দিয়ে সংসার চলতো। ফুসফুসে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ সালে মারা যান বাবা। বাবার মৃত্যুতে সংসারের সব এলোমেলো হয়ে যায় আলমের। ঘোর অন্ধকার নেমে আসে পরিবারে, থমকে যায় আলমের জীবন। পাঁচ সদস্যের সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে।

কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধী আলমকে কে দেবে কাজ? কাজ না পাওয়ার হতাশা আর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় নিজেকে নিয়ে কী করবেন তা ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি। অনেক কষ্টে বিভিন্ন লোকজনদের কাছে ধরনা দিয়ে নগরীর পোর্ট রোডের একটি মাছের আড়তে কাজ পান আলম। মাছের আড়তের কর্মচারীর ক’টাকাই বা বেতন। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় প্রতি মাসেই। সংসার চালানো মানে, দু’বেলা ভাতের ব্যবস্থা করা।

শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও পরিবারের দু’বেলা খাবার জোগাতে কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে জাতীয় দলে লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব করা আলমকে। আলম খানের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কোটখালী গ্রামে। জীবিকার সন্ধানে প্রায় দুই যুগ আগে আলমের পরিবার চলে আসে বরিশাল নগরীতে। এখন থাকেন নগরীর বটতলা বাজার সংলগ্ন রাজু মিয়ার পোল এলাকায় টিনের চালায় টিনের বেড়া দিয়ে তৈরি জীর্ণ দুটি কক্ষে। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় আলম।

২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়কত্ব করা আলম খানের জীবন সংগ্রামের গল্পটি এমনই। তার নেতৃত্বে দেশ ও বিদেশের মাটিতে ১১টি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল। এর মধ্যে ৭টিতেই জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

একসময় অধিনায়ক পদবিটা তার জন্য চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৮ সালের শেষ দিকে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন আলম। আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে বিশেষ পারদর্শী আলম। ব্যাট হাতে একাই ম্যাচ জিতিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন তিনি। ডান হাতি অফস্পিনে মাপা লাইনলেন্থের বোলিংয়ে প্রতিপক্ষের রানের চাকা আটকে দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এনে দিতে পারেন।

কয়েক বছর আগে ভারতের মাটিতে ভারতের শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের বিপক্ষে ২০ ওভারের ম্যাচে খেলেছিলেন ৫৪ বলে ১১৪ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস, পাশাপাশি ৪ ওভারে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। তিন ম্যাচ সিরিজের বাকি দুটিতে ৮ উইকেট শিকার করেছিলেন আলম। ২-১ ব্যবধানে ভারতের বিপক্ষে সিরিজে জয় পায় বংলাদেশ, ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হন আলম।

দেশের হয়ে লাল সবুজ জার্সিতে গত পাঁচ বছরে ইংল্যান্ড, পকিস্তান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে একাধিক ম্যাচ খেলেছেন আলম। পারফরম্যান্স ছিল বেশ ভালো। প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের আস্থা ও ভরসার অন্যতম নাম আলম।

অথচ আলম যে চলাফেরা করতে পারবেন- জীবনের একটা সময় পর্যন্ত এ নিয়ে সংশয় ছিল তার পরিবারের অনেকের। কিন্তু আলম এগিয় গেছেন নিজের ইচ্ছাপূরণের লক্ষ্যে। চলতে-ফিরতে প্রচণ্ড অসুবিধা হতো, তবু চেষ্টা করে গেছেন। অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে ক্রিকেট খেলেছেন।

দারিদ্র্যতা ও শারীরিক অক্ষমতাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে যাওয়া আলম খানের সঙ্গে নগরীর পোর্ট রোডের মাহিমা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি মাছের আড়তে বসে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। আলাপকালে আলম শোনালেন তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি, জানালেন ক্রিকেট নিয়ে তার স্বপ্ন আর বেড়ে ওঠার কথা।

আলম বলেন, ‘১৯৮৮ সালের ১০ ডিসেম্বর আমার জন্ম। জন্মের পর ভালই ছিলাম। কিন্তু সাড়ে ৩ মাস বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হই। তখন তো আর আমি অত কিছু বুঝতাম না। বড় হয়ে শুনেছি, প্রচন্ড জ্বর ছিল বেশ কয়েকদিন। এরপর শরীরের নিচের অংশ শুঁকিয়ে যেতে থাকে, বাঁকা হতে শুরু করে দু’পায়ের পাতা। এ অবস্থায় বাবা-মা সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। নানান জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন, কিন্তু লাভ হয়নি। পায়ে শক্তি না থাকায় ৯ বছর পর্যন্ত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। এরপর আস্তে আস্তে দাঁড়াতে পারলাম, পায়ে কিছুটা জোর পেলাম।’

এর আগেই সংসারে অভাব ঘিরে ধরল। অভাবের জন্য পেট ভরে তিন বেলা ঠিকমতো ভাতই জুটত না। তখন বাবা, মা ও আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে চলে আসেন বরিশাল নগরীতে। শুরু হয় বেঁচে থাকার লড়াই। নগরীতে একটি ঘর ভাড়া নেন। পরিবারের সদস্যদের দু’মুঠো খাবার জোগাড়ে রাস্তার পাশে ছোট একটি খাবার দোকান দিয়ে বসেন বাবা। তখন আলমের বয়স ৭-৮ হবে, ছোট ভাইয়ের ১-২ বছর। অনেক ঘুরে বেসরকারি একটি কারখানায় কাজ পেয়ে যান তার বাবা। তার উপার্জনে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছিল সংসারে।

জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার আলম বলেন, ‘এক পা, দু পা করে ১২ বছর বয়সে হাঁটতে শিখি। তখন বাবা স্কুলে ভর্তি করে দেন। স্কুলে যাওয়া আসার পথে মাঠে ক্রিকেট খেলতে দেখতাম কিশোরদের। এরপর মাঝেমাঝেই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে খেলা দেখতাম। শরীর না পারলেও মনে বড় আশা ছিল, যদি খেলতে পারতাম। প্রথমে বল কুড়িয়ে দিতাম। একদিন লোকজন কম থাকায় খেলার সুযোগ পেয়ে যাই। টেনিস বল দিয়েই ক্রিকেটে হাতেখড়ি। টেনিস থেকে ফাইভ স্টার, এরপর টেপ টেনিসে।’

‘এরপর নিজ এলাকার হয়ে বিভিন্ন পাড়ার সঙ্গে খেলতে শুরু করে দিয়েছি। শৈশবে ক্রিকেট খেলার কারণে বাবার হাতে অনেক পিটুনি খেতে হয়েছে। কিন্তু ক্রিকেট খেলা ততদিনে নেশা হয়ে গিয়েছিল। মা আমার খেলা পছন্দ করতেন। লুকিয়ে ব্যাট-বল কিনতে টাকা দিতেন। ক্রিকেটই ছিল আমার ধ্যানজ্ঞান। অভাব আর ক্রিকেট খেলার কারণে এসএসসি পাশের পর কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি।’

তিনি বলতে থাকেন, ‘ছোটবেলা থেকেই পায়ের সমস্যার কারণে অনেকে তুচ্ছতাছিল্য করেছেন। এ কথা শুনে শুনেই বেড়ে উঠেছি যে, সে ওটা পারবে না, এটা পারবে না। একটা জেদ তাই ছিল। ছোটবেলা থেকে কোনো খেলাব আমি শারীরিক-অসমর্থদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিনি। অনেক পুরস্কার-মেডেল জিতেছি শারীরিকভাবে শক্ত-সমর্থদের সঙ্গে লড়াই করে। খেলার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। একাধারে ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করেছি।’

২০১৫ সালের মার্চ মাসে জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলগঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সারাদেশ থেকে প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুঁজে বের করতে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) নেয় বেশ কিছু কার্যকরী উদ্যোগ। খেলোয়াড় নির্বাচন করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিসিবি, বিকেএসপি ও বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করা হয় এক প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি।

এ কর্মসূচিতে অংশ নেন মোট ১৫৬ জন ক্রিকেটার। পরে সেখান থেকে নেমে আসে ৫০ জনে। এক সপ্তাহের ক্যাম্পের পর সংখ্যাটা আসে ৩৬ জনে। এরপর ৩০, অতঃপর ২৪ জন, সর্বশেষ ২০ জনের দল। এই ২০ ক্রিকেটারকে নিয়ে বিকেএসপিতে চলে যাচাই-বাছাই। সেখান থেকে নির্বাচন করা হয় ১৫ জনের চূড়ান্ত স্কোয়াড।

বাছাইয়ে ব্যাটে-বলে দারুণ করেছিলেন আলম। চূড়ান্ত স্কোয়াডে প্রথম দিকে নাম ছিল তার। ঐ বছরের সেপ্টেম্বরে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আইসিআরসি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক করা হয়েছিল আলমকে।

সে অনুভূতির স্মৃতিচারণ করে আলম বলেন, ‘স্বপ্নপূরণের পথে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ায় খুব আনন্দ হয়েছিল সেদিন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান অংশ নিয়েছিল টুর্নামেন্টে। আমাদের জন্য আরও চমক অপেক্ষা করছিল। ২ সেপ্টেম্বর টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান এবং বিসিবি ও টুর্নামেন্টের আয়োজক আইসিআরসি কর্মকর্তারা। শুভেচ্ছাদূত ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের মাশরাফি বিন মর্তুজা।’

উদ্বোধনী বক্তৃতায় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলকে শুভেচ্ছা ও সফলতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ইচ্ছা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই যে স্বপ্নপূরণের বাধা হতে পারে না, আপনারা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলেও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে খেলাধুলায় দক্ষতা অর্জন সম্ভব।

শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের জীবনের মানোন্নয়নে সরকারের অঙ্গীকারের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেছিলেন, আমাদের লক্ষ্য এমন একটা সমাজ গড়া, যেখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। একদিন পর বোর্ড কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সভাশেষে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান জানিয়েছিলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা শাখা করার পরিকল্পনার কথা, প্রতিবন্ধীদের জন্য করা হবে আলাদা বিভাগ। ঐ বিভাগ বাংলাদেশে যত প্রতিবন্ধী ক্রিকেট-প্রতিভা আছে, তাদের খুঁজে বের করবে। ক্রিকেটারদের নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা জানান বিসিবি সভাপতি।

আলম খান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার একদিনের মাথায় বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানের এমন ঘোষণায় আমিসহ শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। কী বলব! এমনটা এত তাড়াতাড়ি আশাই করিনি। আমার মত স্বপ্ন দেখতে শুরু করে শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের খেলোয়াড়রা।’

কিন্তু ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বিসিবিকে কোন ধরনের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। আলম খান ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘সবাই বাইরে থেকে মনে করে আমরা জাতীয় দলে খেলি, খেলতে যাই বিদেশে। তারা মনে করেন, তামিম, মুশফিকদের মত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে নিয়মিত বেতন পাই। আমাদের ভেতরের কষ্টটা কেউ দেখে না। জাতীয় দলের হয়ে খেললেও গত ৫ বছরে পারিশ্রমিক হিসেবে এক টাকাও পাইনি। কত কষ্ট করে চলতে হয়, তা কেউ জানে না। জানি না সামনে কী হবে। টাকার অভাবে ক্রিকেটকে ঘিরে আমার সব স্বপ্ন হারিয়ে যাবে কি না, এখন সেই শঙ্কায় থাকি।’

‘বিভিন্ন সাফল্যের পাশপাশি দেশের জন্য সুনাম ঠিকই বয়ে এনেছে এই প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল। তবে দেশের জন্য সাফল্য বয়ে আনা প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা ভালো নেই। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের দেশের হয়ে খেলার পড়েও হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

অথচ ক্রিকেট বাণিজ্যে যে বোর্ডের অবস্থান এখন প্রথম সারিতে, যে বোর্ড জাতীয় ক্রিকেট দলের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে পারে অনায়াসে, তাদের প্রতিবন্ধী ক্রিকেটের এমন দৈন্যদশা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে। আলম বলেন, ‘বাবা মা সারাজীবন অনেক কষ্ট করেছেন। স্বপ্ন ছিল তাদের ভাল থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করার। ভাগ্য সেই স্বপ্নপূরণ হতে দেয়নি। ২০০০ সালের পর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারাখানার চাকরি ছাড়তে হয় তাকে। এরপর ছোট একটি খাবার হোটেল দিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ফুসফুসে ক্যান্সারে ধুকে ধুকে ২০১৮ সালে বাবা মারা যান। বাবা চিকিৎসার জন্য শেষ সম্বল গ্রামের ভিটেমাটিটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে। এক বছরের মাথায় ২০১৯ সালে বাবার পর মা’ও পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। সংসার সামলাবে কে? অনেকটা বাধ্য হয়েই ঐ বছর গ্রামের এক মেয়েকে বিয়ে করি। এখন ছোট ভাই, স্ত্রী, আরেক মামাতো ভাইসহ সংসারে সদস্যের সংখ্যা ৪ জন।’

আলম বলেন, ‘প্রতিবন্ধী দলে প্রতিভাবান ক্রিকেট খেলোয়াড় আছে। বিদেশের মাটিতেও তারা অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে। দেশের জন্য আমরাও কিছু করতে চাই। খেলার সরঞ্জাম, জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘ অনুশীলন এবং মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করা হলে কেউই আমাদের থামাতে পারবে না। আমার বিশ্বাস অন্য খেলায় বিশ্বকাপ পাওয়ার আগেই প্রতিবন্ধী ক্রিকেট খেলোয়াড়রা বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ উপহার দিতে পারবে।’

বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের মাহিমা এন্টারপ্রাইজের মাছের আড়তের মালিক নিরব হোসেন টুটুল বলেন, কয়েক বছর ধরে তার আড়তে আলম কাজ করছে। ঝড়বৃষ্টি মধ্যেও আলম কাজে এসেছে। কাজে ফাকি দেয়নি কখনও, সৎ ও নিষ্ঠাবান সে। তবে বাংলাদেশসহ তার পছন্দের দলের খেলা থাকলে ব্যকুল হয়ে ওঠে। ছুটি নিয়ে টিভিতে খেলা দেখে। ক্রিকেটের প্রতি প্রবল আগ্রহ তার।

তিনি আরও বলেন, ‘আলম বরিশালের গৌরব। ক্রিকেটের জন্য জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হচ্ছে আলমকে। ক্রিকেট খেলায় আলমের বড় বাধা অর্থনৈতিক সংকট। সেই বাধা ডিঙোতে আলমের সহায়তা প্রয়োজন। আলমের মত প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অকালে ঝরে পড়া রোধে বিসিবি, জেলা ক্রীড়াসংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।

বরিশাল নগরীর বাসিন্দা ও জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় কামরুল ইসলাম রাব্বি বলেন, ‘আলম আমার পছন্দের মানুষ। কিশোর বয়সে তার সঙ্গে টেপটেনিসে অনেক খেলেছি। বাধাবিপত্তি পেরিয়ে জীবনে যে অনেক দূর এগোনো যায়, আলম তার বড় প্রমাণ। তার মত প্রতিবন্ধী ক্রিকেটারদের জন্য আলাদা জায়গা, মাঠ, প্র্যাকটিসের সুযোগ ইত্যাদি দরকার। এসব ব্যাপারে গুরুত্ব প্রয়োজন। বিসিবিসহ কতৃর্পক্ষ গুরুত্ব দিলে ধীরে ধীরে মানুষও গুরুত্ব দেবে। কেউ তাদের বোঝা মনে করবে না। এভাবে সমাজ-পরিবার প্রতিবন্ধী ক্রিকেটকে গুরুত্বের চোখে দেখবে।

বরিশাল বিভাগীয় ক্রিকেট দলের কোচ ও সাবেক ক্রিকেটার তাসরিকুল ইসলাম টোটাম জানান, ‘প্রায় দেড় দশক ধরে তাকে আমি চিনি। আলম যখন কিশোর ছিল মাঝেমধ্যে আমার কাছে এসে ব্যাটিং-বোলিং নিয়ে নানা প্রশ্ন করত। তাকে বলে দিলে মাঠের এক পাশে গিয়ে নিজে নিজেই দীর্ঘক্ষণ সেগুলো প্রাকটিস করত। এভাবে একা একাই অনুশীলন করে ব্যাটিং বোলিংয়ে উন্নতি করতে থাকে। শারীরিক প্রতিবন্ধী আলম এখন যে ক্রিকেট বলে যে এত নিখুঁতভাবে স্ট্রোক খেলতে পারে, সেটি না দেখলে বোঝা যাবে না। তার প্রতিভা আছে, টেকনিক দুর্দান্ত, হাতে শটও আছে। অনুর্ধ ১৭, ১৯ ও জেলা ক্রিকেট দলের হয়ে খেলেছে আলম। সুস্থ-সবল ক্রিকেটারদের সঙ্গে লড়াই করেই এসব পর্যায়ের তার খেলার সুযোগ হয়েছে। নিজেকে বারবার প্রমাণ করে চলেছে আলম। মাঠের ২২ গজের মধ্যে আলমের মানসিক শক্তি দেখে আমি অবাক। আলমের ব্যাটিং দেখে মনে হয় না ওর কোনো শারীরিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খুবই সাবলীল ব্যাটিং করে। পাওয়ার ক্রিকেট খেলার দারুন সামর্থ্য রয়েছে ওর। পায়ের সমস্যা থাকায় দৌড়ে রান করার বদলে চার-ছক্কাতেই বেশি ঝোঁক।

তাসরিকুল ইসলাম টোটাম আরও জানান, জাতীয় শারীরিক প্রতিবন্ধী দলের হয়েও আলম ভাল খেলছেন। আলমের নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী দল ভারত, ইংল্যান্ডসহ শক্তিশালী দলগুলোকে হারিয়েছে। এ দলটির সাফল্য রয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটাঙ্গনে। তারাও ক্রিকেট খেলে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। ক্রিকেট বোর্ড যদি কিছুটা সাহায্য করে, এরা কিন্তু অনেক দূর যাবে। বিশ্বের অন্য দলগুলোকে নিয়মিত হারানোর সামর্থ্য আছে এদের।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ন্যাশনাল গেমস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ কাওসার বলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড অনেক আগে থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী খেলোয়াড়দের টেকনিক্যাল সহায়তা দিয়ে আসছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা সহ খেলার মান উন্নয়নে ক্রিকেট বোর্ডের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে সব ধরনের খেলাই থমকে গেছে। এ পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেকটাই দুরূহ ব্যাপার হবে। তারপরও বোর্ডের বিবেচনায় রয়েছে বিষয়টি।’

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ