ঢাকা বুধবার, জানুয়ারী ২০, ২০২১

৩২ দিন সাগরে ভেসে থাকার গল্প শোনালেন নজির মাঝি


|| প্রকাশিত: 4:18 pm , January 11, 2021

পিনিউজ২৪ ডেস্ক: মো. নজরুল ইসলাম। পেশায় ট্রলার মাঝি। নজির মাঝি নামে চেনে সবাই। তার বয়স ৬৪ বছর। এখন আর নিয়মিত সমুদ্রে যান না। বদলি মাঝি হিসেবে মাঝে মধ্যে ট্রলারের হাল ধরেন। গেলো ৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় এফবি আল-হাসান নামের একটি মাছধরা ট্রলার নিয়ে সমুদ্রে যান।

পটুয়াখালীর মৎস্য বন্দর মহিপুরের মেসার্স মনোয়ারা ফিসের ঘাট থেকে গভীর সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গী ছিলেন আরও ১৭ জন জেলে। সমুদ্রে মাছ শিকার করা অবস্থায় ৮ দিনের মাথায় ট্রলারের ইঞ্জিন বিকল হয়। ভাসতে ভাসতে গভীর সমুদ্রে চলে যায় ট্রলার। জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন সবাই। ৩২ দিন পর নৌবাহিনীর সাহায্যে বাঁচার স্বপ্ন টিকে যায়। ফিরে আসেন তীরে। থেমে গেছে স্বজনদের কান্না। বলছি নজির মাঝির ফিরে আসার গল্প।

নজির মাঝির বাড়ি পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নের মম্বিপাড়া গ্রামে। তার ফিরে আসার খবর শুনে সরেজমিনে কথা হয় এ প্রতিনিধির সঙ্গে। তিনি বলেন, আট দিনে প্রায় দুই লাখ টাকার মাছ ধরছি। মাছ ধরা অবস্থায় গেলো ১৭ ডিসেম্বর হঠাৎ ট্রলারের ইঞ্জিন নষ্ট হয়। এরপর শত চেষ্টা করেও আর ইঞ্জিন ঠিক করা সম্ভব হয়নি। সাগরে ভাসতে ছিলাম। ট্রলার ভাসতে ভাসতে গভীর সমুদ্রের দিকে যাচ্ছে। গেরাপি মেরে ট্রলার থামানো যাচ্ছে না। ট্রলারের বাজার সওদায়, জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে। সমুদ্রের পানি লবণ। তাই খাবার পানির জন্য ট্রলারে থাকা বরফ পানির ১২টি ড্রামে ভর্তি করি। তাতে চার ড্রাম পানি হয়েছে। বরফ গলা পানি পান করছি আমরা। শিকার করা মাছ আগুনে পুড়ে খাচ্ছি। যখন জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে তখন মাছ কেটে কেটে রোদে শুকিয়ে শুকনা মাছ খেয়েছি। এভাবেই দিন-রাত কেটে যাচ্ছে।

ট্রলার আস্তে আস্তে গভীর সমুদ্রে আড়াই’শ বাম পানিতে চলে গেছে। আমরা সবাই বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছি। কারণ এত গভীর সমুদ্রে কোনও ট্রলার বা জাহাজ আসার কথা না। হঠাৎ ২৭ দিনের মাথায় দূর থেকে একটি জাহাজ দেখতে পাই। কিন্তু জাহাজ আমাদের দেখেনি। অন্যত্র চলে গেছে। ঠিক এর পরদিন একটি জাহাজ আমাদের ট্রলার দেখে কাছে আসে এবং আমাদের খাবার দেয়। তারপর অন্য একটি জাহাজ খবর দিয়ে আমাদের ২০ ঘণ্টা টেনে সেন্টমার্টিন নিয়ে আসে। সেখানে আমাদের সকলের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করেন। পরের দিন আসরের পর অন্য একটি ট্রলারে বেঁধে সেন্টমার্টিন থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেয়। পরের দিন সকাল ১০ টায় কক্সবাজার এসে পৌঁছি। ট্রলার কক্সবাজার রেখে গতকাল (০৯ জানুযায়ী) সন্ধ্যায় বাড়ি এসে পৌঁছেছি।

এদিকে গেলো শনিবার আইএসপিআর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, গেলো বৃহস্পতিবার সেন্টমার্টিন থেকে ৮৩ নটিক্যাল মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান অবস্থায় ট্রলারটি উদ্ধার করা হয়। নৌবাহিনীর জাহাজ নির্মূল ও অতন্দ্র গভীর সাগরে ভাসমান অবস্থায় জেলেসহ ট্রলারটি উদ্ধার করে। তীব্র পানি ও খাদ্য সংকটে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল অবস্থায় জেলেদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাদ্য দেয়া হয়।
শনিবার রাতে কোস্টগার্ড সেন্টমার্টিন স্টেশনের কর্মকর্তা লে. কমান্ডার আসিফ মোহাম্মদ আলী জানান, উদ্ধার করা জেলেদের নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

বাড়ি ফিরে আসা অন্যান্য জেলেরা হচ্ছেন, পটুয়াখালী জেলার মহিপুর সদর ইউনিয়নের নজিবপুর গ্রামের আল-আমিন (২১), বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার ছোট বগি এলাকার শাকিল (১৪), শামিম (৩৮), তোফাজ্জেল হোসেন ফকির (৫২), রমজান তালুকদার (৫০), শাহ আলম (৪০), আ. আজিজ (৪৩), খলিল (৩৯), হোসেন (৩৮) এবং লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার হাফিজুল্লাহ (৫০), কাশেম (৫০), ইউসুফ (৪২), বাবুল (৪২), আবুল কাশেম (৪২), কবির হোসেন (৪২), বাবলু (৪২) ও শ্রী জগানাত (৪৮)।

নজির মাঝি বলেন, ট্রলার মালিক হানিফ খলিফা আমাদের সাথে প্রতারণা করেছেন। শহিদ কোম্পানির চার বছর ব্যবহৃত পুরানো বাতিল ইঞ্জিন এনে ট্রলারে স্থাপন করেছেন। যা আমার জানা ছিলো না। পুরানো ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিলে সমুদ্রে থাকা অবস্থায় ঠিক করা সম্ভব হয় না। ফিটনেসবিহীন ট্রলার নিয়ে সাগরে মাছ শিকারে না যাওয়ার জন্য আমি সকলকে অনুরোধ করছি।

এই বিভাগের আরও খবর
সর্বশেষ